ঈশ্বর দর্শন
মানব শরীর এবং তার সাথে মানব মস্তিষ্ক দীর্ঘ বিবর্তনের পথ ধরে এমন এক জটিল কর্ম পদ্ধতি অর্জন করেছে যার দরুন মানুষই বোধহয় শ্রেষ্ঠ জীব।মানব মস্তিষ্কের এই জটিল কার্য পদ্ধতির কিছু কিছু বিষয় বিজ্ঞান সাধকদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে একটু একটু করে রহস্য জাল উন্মোচিত হচ্ছে;আশা রাখি অদূর ভবিষ্যৎ-এ মানব মস্তিষ্কের আরো অনেক অজানা বিষয়কে আমরা জানতে পারবো। একটা সময় ছিল যখন প্রতিটি ধর্মভীরু মানুষ বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর আছে এবং তিনি কিছু বিশিষ্ট সাধকের সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকেই দর্শন দিয়ে থাকেন ;সাধক নিজেও এমন সব কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে বসান যাতে তাঁর মধ্যে ঈশ্বরের আগমন সম্পর্কে কারো কোন সন্দেহ থাকতো না ;তিনি তখন ঈশ্বরের অবতার হিসাবে পরিচিত হতেন।কিন্তু সাধকের এমন অস্বাভিক আচরনের পিছনে যে মস্তিষ্কের জটিল কর্মকাণ্ডই দায়ী তা কিন্তু কারো জানা ছিলনা;মনোবিজ্ঞানীরাই আজ সেই রহস্যের সমাধান দিয়েছেন।
@মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ভ্রান্ত অনুভূতি চার প্রকারের হয়ে থাকে যথা (১) Illusion(ভ্রান্ত অনুভূতি),(২) Hallucination (অলীক বিশ্বাস),(৩) Delusion (মোহ,অন্ধ ভ্রান্ত ধারনা) ও (৪) Paranoia(বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত মস্তিষ্ক বিকৃতি)।
মানুষের মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু কোষকে নিস্তেজ রেখে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন Hallucination বা Delusion এর অবস্থা সৃষ্টি করে ঈশ্বরের দেখা পাওয়া,ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলার অনুভূতি সৃষ্টি সম্ভব।এখন প্রতিটি বিষয় একটু ছোটো করে জেনে নেওয়া যাক....
(১) Illusion (ভ্রান্ত অনুভূতি):কোন বস্তু প্রকৃতপক্ষে যা তাকে সেই ভাবে উপলব্ধি না করাই হল Illusion.
ধরুন, একটা কাচের গ্লাসে জল নিয়ে তাতে একটা চামচ ডুবিয়ে দিলেন;তাহলে দেখবেন চামচটা বাঁকা দেখাচ্ছে।এটা একটা ভ্রান্ত অনুভূতি।আবার ধরুন আপিনার অজান্তে কেউ একটা সরু দড়ি হঠাৎই আপনার ঘাড়ের উপর ফেলে দিলো, আর অমনি আপনি 'বিছে' বলে ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন।এটি মস্তিষ্কের ভ্রান্ত ধারনারই ফল।এই ভ্রান্ত অনুভূতি আবার বিভিন্ন রকম হতে পারে যেমন,Optical Illusion(দর্শাণুভূতির ভ্রম),Auditory Illusion(শ্রবনাণুভূতির ভ্রম),Tactile Illusion(স্পর্শাণুভূতির ভ্রম),Olfactory Illusion(ঘ্রাণাণুভূতির ভ্রম) ও Taste Illusion(স্বাদ গ্রহনের ভ্রম)।
(২)Hallucination(অলীক বিশ্বাস): অলীক বা অস্তিত্বহীন কোন কিছু সম্পর্কে অনুভূতি লাভ করাকেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় hallucination বলা হয়।
(a)ধরুন, প্রতুল বাবু একজন ধার্মিক মানুষ,ঈশ্বরের উপর তাঁর অগাধ আস্থা।তাই অফিস বেরোনোর আগে তিনি পূজা-অর্চনা সেরে তবেই বেরোন।সেদিন শনিবার, মা কালীর ছবিতে মালা পরিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপ-ধুনো দিয়ে পূজো করছেন ভক্তি ভরে,হঠাৎ দেখতে পেলেন মা কালী ছবি ছেড়ে এক'পা এক'পা করে বেরিয়ে এলেন।সাধারণত Optical Hallucination -এর রোগীরা এই ধরনের দৃশ্য দেখে থাকেন।
(b) Private sector এ job করা সুন্দরী তরুণী সোমা কিছুদিন হল পথ দুর্ঘটনায় স্বামী প্রতুলকে হারিয়েছে।অফিসের কলিগ সুমন্ত ছেলেটাকে সোমার বেশ ভালো লাগতো পূর্ব থেকেই।একসময় দু-জন দু-জনকে ভীষণভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে লাগলো।সুমন্তই একদিন বিয়ের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেললো সোমাকে।সেইদিন রাতে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা মৃত স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে সোমা কি যেন ভাবছিল।হঠাৎ প্রতুলের গলায় স্পষ্ট শুনতে পেলো,"তুমি আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে সোমা?" Auditory hallucination -এর রোগীরা এই ধরনের কথা শুনতে পান।
বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক যেমন,গাঁজা,L.S.D,ভাঙ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় মাত্রায় শরীরে গ্রহন করলে অনেক সময় তুরীয় আনন্দ,আধ্যাত্মিক আনন্দ,দেবদর্শন বা দৈববাণী শোনা যায়।
(৩)Delusion(মোহ,অন্ধ ভ্রান্ত ধরনা):বদ্ধমূল কিছু ভ্রান্ত ধরনা।যুক্তিহীন ভ্রান্ত ধরনা অসুস্থ মস্তিষ্কেরই ফল।রামকৃষ্ণ দেব,রামপ্রসাদ,বামাক্ষ্যাপা(*এঁদের উপর আধ্যাত্মিক প্রভাব পরে আলোচিত) গভীর ভাবে বিশ্বাস করতেন মা কালী বা মা তারা তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন, ঘুরছেন,দৈনন্দিন কাজকর্মে সাহায্য করছেন।দীর্ঘকাল ধরে লালিত বিশ্বাসই একসময় বদ্ধমূল ভ্রান্ত বিশ্বাস বা Delusion -এ পরিণত হয়।
@প্যাভলভের মতে Delusion এর উৎপত্তির মূলে রয়েছে প্রথমত মস্তিষ্ক স্নায়ু কোষের বিকারগত অনড়ত্ব,আর দ্বিতীয় কারন হলো,অতি স্ববিরোধী মানসিক অবস্থা।এই দুটি ব্যাপারই একসঙ্গে বা পরপর ঘটতে পারে। সেই অনুসারে Delusion রোগীর উপসর্গেও কিছু হেরফের হয়।
(৪)Paranoia(বদ্ধমূল ভ্রান্তিজনিত মস্তিষ্ক বিকৃতি):এই রোগীরা Delusion রোগীর মতোই অন্ধ ভ্রান্ত বিশ্বাসের দ্বারা পরিচালিত হয় বটে, কিন্তু paranoia রোগী তার এই বিশ্বাসের পেছনে এমন সুন্দর যুক্তি হাজির করতে থাকেন যে,একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পক্ষে অনেক সময় বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
@মনোবিজ্ঞানী ম্যাকডুগালের মতে -Paranoia রোগীর গোপন মনে হীনমন্যতা বোধ বা পাপবোধ লুকিয়ে থাকার দরুন ভ্রান্ত বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে একধরনের শান্তি পায়।নিজের অন্যায় কাজকে 'জাস্টিফাই' করে প্রশান্তি পায়।
**এখন আমরা দেখবো কয়েকজন ঈশ্বর সেবক ও ঈশ্বর দর্শনকারী মানুষের জীবনের ঘটনাবলী ;যা থেকে বুঝতে সুবিধে হবে কিভাবে তাঁদের মস্তিষ্ক প্রভাবিত।.....
(1)বামাক্ষ্যাপাঃ বামাক্ষ্যাপার জন্ম তারা পীঠের দক্ষিনে অটলা গ্রামে।পিতা সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন গায়ক ও বেহালাবাদক।দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তিনি সন্ধ্যার পরে যেতেন তারা মন্দিরে।সেখানে আলো জ্বেলে সতরঞ্চী বিছিয়ে ছেলেরা গাইত মায়ের স্তবগান, আর বাবা বাজাতেন বেহালা।গান গাইতে গাইতে ছেলে বামাচরান কেঁদে ফেলতেন(অতি আবেগপ্রবণ মন)।একদিন গাইতে গাইতে বামাচরন অর্থাৎ বামাক্ষ্যাপা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন।অচেতন ছেলেকে কোলে নিয়ে মা 'তারা,তারা' বলে কেঁদে উঠলেন।অমনি 'তারা' শব্দে ছেলের সঙ্গা ফিরল।সংসারের কোন কাজেই বামাচরনের মন ছিলনা,দিন-রাত তারা-মাকে মা বলে ডাকেন।পাঠাশালায় গুরুমশাই লিখতে বললে, তিনি লেখেন 'জয় মা তারা!' তারাপীঠে সাধুসঙ্গ করেন, আর মাঝে মাঝে 'তারা,তারা বলে কেঁদে ওঠেন।সময়মত কোন কাজই করেন না। কেবল 'মা,মা বলে চিৎকার করে কাঁদেন(মস্তিষ্ক স্নায়ু কোষের বিকারগত অনড়ত্ব)।
(1)রামকৃষ্ণ দেবঃ রামকৃষ্ণ দেবকে নিয়ে আলোচোনার আগে তাঁর উপর তারঁ পিতামাতার প্রভাব কতখানি ছিল তা একটু দেখে নেওয়া যাক....কামারপুকুরের দরিদ্র ব্রাহ্মণ ক্ষুদিরাম ও তাঁর স্ত্রী চন্দ্রমনি ছিলেন সরল ও ঈশ্বরন্ত প্রাণ।একবার ক্ষুদিরাম গয়া ধাম দর্শনে গিয়ে স্বপ্নে দেখলেন, স্বয়ং নারায়ন তাঁকে বলছেন 'তিনি ক্ষুদিরামের সন্তান হয়ে জন্মগ্রহন করবেন'(সাধারনত বদ্ধমূল ঈশ্বর বিশ্বাস)।একদিন কামার পুকুরে একটি শিবমন্দিরে হঠাৎ চন্দ্রমনি দেবী অজ্ঞান হয়ে পড়লেন এবং সেই অবস্থাতেই তিনি দেখলেন মন্দিরের বিগ্রহ থেকে একটি জ্যোতির্বলয় বিচ্ছুরিত হয়ে তাঁর দেহে মিলিয়ে গেল।ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই চন্দ্রমণি অনুভব করলেন, তিনি গর্ভবতী। ১৮৫৬ খ্রিঃ ভবতারিণী মন্দিরের অন্যতম পূজারী রামকুমার দেহত্যাগ করলে,রামকৃষ্ণ দেব পূজারীর পদে স্থায়ী হন।তখন থেকেই তাঁর দেবোত্তম ভাব ও অলৌকিক দর্শনের শুরু।বিভিন্ন ধর্মের প্রতি তিনি ছিলেন মোহগ্রস্ত। যেমন, শম্ভু মালিকের বাগানে বাইবেল শুনে খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই ধর্মের সাধন অবস্থায় যিশুর কথা ভাবছিলেন,সেই সময় দেখলেন এক অপূর্ব দ্যুতিময় সুন্দর পুরুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁর মধ্যে বিলীন হয়ে গেলেন।
*আর একবার ইসলাম ধর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে তিনি এক সাধকের কাছে দীক্ষা নিলেন। এই ধর্ম সাধন কালে তিনি দীর্ঘ শ্মশ্রুবিশিষ্ট, গম্ভীর জ্যোতির্ময় পুরুষের সাক্ষাৎ লাভ করেন।
*রামকৃষ্ণ দেব তাঁর স্ত্রীকে সাক্ষাৎ জগদম্বা রূপে কালী পূজোর দিনে পূজো করেছেন।
(মস্তিষ্ক অনড়ত্ব বিষয়ে পাঠক বর্গের অবগতির উদ্দেশ্যে জীবনী গুলো একটু উল্লেখ করা হল;তবে বহু পাঠাক এবিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ)

Comments
Post a Comment